আদর্শ হিন্দু হোটেল- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়- রিভিউ

তারিখ:

পোস্ট শেয়ার করুন:

আদর্শ হিন্দু হোটেল- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়- রিভিউ

বইয়ের নাম : ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’
লেখক : বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
মলাট মূল্য : ২৫০ টাকা

বুক রিভিউ-

‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’ বিখ্যাত একটি সামাজিক উপন্যাস। এর প্রকাশকাল ১৯৪০ সালে ইংরেজ সময়ের পটভূমিতে এ উপন্যাসে তৎকালীন ব্রাহ্মণ সমাজের একজন ‘রাঁধুনী বামুন’, হাজারি দেবশর্মার জীবন কথা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন।

বিভূতিভূষন বন্দ্যোপাধ্যায় By Unknown author – Source, Public Domain, https://commons.wikimedia.org/w/index.php?curid=14850074

হাজারি ঠাকুর রাণাঘাটের বেল বাজারে বেচু চক্কত্তির হোটেলে রাঁধুনী বামুন হিসেবে কাজ করে। এখানে তিনি দীর্ঘদিন ব্যাপি কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু তার উপরে কাজের ভার বেশি থাকলেও বকশিশ এবং সম্মানের বেলায় তার উল্টো। দেখা যায় প্রায় প্রতিদিন দুপুরে খেতে বসে দেখে তরকারিই থাকে না তেঁতুল দিয়ে ভাত খেতে হয়। আর সময়মত কাজ করতে না পারলে হাজারটা গালি শুনতে হয় পদ্ম ঝি এর কাছ থেকে। আর ছোট খাটো দোষে বেতন কাটা তো আছেই। এ হোটেলে হাজারি ঠাকুরের জীবন মোটেও ভালো যাচ্ছিল না।

তবে হাজারি ঠাকুরের রান্নার হাত অসাধারণ। পরক্ষভাবে বলতে গেলে বেচু চক্রবর্তীর হোটেল চলেই হাজারি ঠাকুরের রান্নার গুণে। খদ্দের বাবুরা সকলেই হাজারি ঠাকুরের রান্নার সুখ্যাতি করে। কিন্তু এতো সুখ্যাতির পরও পদ্ম ঝি মানতে নারাজ যে হাজারি ঠাকুর একজন ভালো রাঁধুনী।হাজারি ঠাকুর রান্না শিখেছিলেন এঁড়োশালার এক বিধবার কাছে যাকে তিনি খুড়ীমা ডাকতেন। হাজারি সবচেয়ে সুন্দর রাঁধে নিরামিষ চচ্চড়ি। তার চচ্চড়ির এতো ভালো হয় যে বেচু চক্কত্তির হোটেলে যে একবার খেয়েছে সে আবার ঘুরে সেখানে এসেছে।

হাজারি ঠাকুরের সাত টাকা বেতনের চাকরি আর সম্মান না পাওয়ায় তার মনের মাঝেই আশা জেগে উঠে। তার মনের ইচ্ছা একদিন সে নিজের হোটেল দিবে। বহুদিন হোটেলে থেকে সে হোটেলের কাজ কারবার সব বুঝে গেছে। তার মনের খুব ইচ্ছা একদিন নিজের হোটেল দিবে সবাই তাকে ‘বাবু’ বলে সম্বোধন করবে। তাই মাঝে মাঝে চূর্ণী নদীর ধারে বসে তার হোটেল দেওয়ার কথা ভাবতে থাকে। তার মনের ইচ্ছা প্রবল ছেচল্লিশ বছর বয়সকেও তাই তার খুব একটা বেশি মনে হয় না। আর হাজারির এইসব মনের ইচ্ছা আলোচনা করে রাণাঘাটে থাকা তার গ্রামের মেয়ে কুসুমকে।

এর মধ্যেই হাজারি ঠাকুরের জীবনে নানা চড়াই উতরাই আসে। হাজারি ঠাকুরকে বাসন চুরির অভিযোগে ফাঁসিয়ে দেয় হোটেলের ঝি পদ্ম। এই অপরাধে জেলও খাটতে হয় তাকে এইসময় তার পাশে ছিল বংশী। কিন্তু তার ভুল না থাকার পরেও হাজারি ঠাকুর তার হোটেলের রাঁধুনীর চাকরি হারায়। হাজারি ঠাকুর তখন পথে নামল তার জীবনের মোড় ঘুরাতে। ভাগ্য হাজারি ঠাকুরের সহায় হলো রাণাঘাট থেকে বের হয়ে মেলায় যাত্রা কারী ব্যবসায়ীদের দেখা পাওয়ায় তাদের রান্নার ভার নিলো হাজারি ঠাকুর আর মেলায় নিজেও কচুরি সিঙ্গারার ছোট ব্যবসা করে লাভ করল খানিক। এরপর হাজারির সাক্ষাৎ হয় গোয়ালবাড়ির এক বউয়ের সাথে কথায় কথায় হাজারি জানায় তার অতীত এবং ভবিষ্যতে নিজের হোটেল দেওয়ার ইচ্ছার কথা। বউটি তাকে সাহায্য করতে উদগ্রীব হয়ে উঠে। হাজারি ঠাকুরকে বলে আপনার কোন প্রকার অর্থের প্রয়োজন হলে অবশ্যই যেন তার কাছ থেকে তা নেয়। হাজারি ঠাকুর তাকে পরবর্তীতে সাহায্য লাগলে অবশ্যই আসবে এ কথা বলে।

এরপর হাজারি ঠাকুর কাজ করে এক কাপড় ব্যবসায়ীর বাড়ির রাঁধুনী হিসেবে । তারপর হাজারি ঠাকুর দেখা করতে যায় তার পরিবারের সাথে গ্রামে। যেখানে তার মেয়ে টেপি এবং তার স্ত্রী থাকে। এরপর হাজারি ঠাকুরের দেখা হয় তার গ্রামের জমিদারের সাথে এবং তার মেয়ে অতসীর সাথে। তারপর হাজারির পরিবর্তন শুরু হতে থাকে সে আবার রাণাঘাটের হোটেলে ফিরে আসে। এর মধ্যে আবার বাড়িতে আসলে দেখা মেলে অতসীর তার বাবার কাছে হোটেল দেওয়ার জন্য টাকা সাহায্য চাইলে তিনি পারবেন না বলেন। যদিও জমিদার সাহেব তাকে মানা করেন সাহায্য করতে কিন্তু জমিদার সাহেবের মেয়ে অতসী দুইশত টাকা দিয়ে হোটেল খোলার প্রাথমিক সাহায্য করেন।

অতসীর দেওয়া দুইশত টাকার সাথে হাজারি ঠাকুরকে সাহায্য করে তার গ্রামের মেয়ে কুসুম। কুসুম তার হাতের চুড়ি বিক্রি করে হাজারি ঠাকুরকে। এরপর রাণাঘাটে এসে বেচু চক্কত্তির হোটেলের কর্মচারী বংশীকে হাজারি বলে তার নিজের হোটেল দেওয়ার কথা। তারপর অতসীর দেওয়া টাকা এবং কুসুমের দেওয়া টাকা দিয়ে শুরু হয়ে যায় হোটেলের ঘর ভাড়া , জিনিস কেনা , ফদ্দ করার কাজ। এবং সবকিছু ঠিকভাবে হয়েও যায়। তারপর পরের মাসের পহেলা তারিখে রেল বাজারে হাজারি তার নতুন হোটেল খোলে এবং নামকরণ করে ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’। হোটেল খোলার দিন থেকেই হাজারির হোটেলের বিক্রি চলছিল ঈর্ষান্বিতভাবে। সততার সাথে কাজ করে যাচ্ছিল হাজারি ঠাকুর।


এর একবছর পর হাজারি তার পরিবার সমেত রাণাঘাটে বসবাস শুরু করে দেয়। হাজারি ঠাকুরের রান্নার জোরে এবং সততায় হোটেল তার ভালোই চলছিল। যদিও বাঁধা আসছিল তা সততার সাথেই পেরিয়ে যাচ্ছিল হাজারি ঠাকুর। এর মাঝে হাজারির হোটেলে যোগদান করে বংশীর ভাগ্নে নরেন। পড়ালেখা জানা এবং দেখতে সুন্দর হওয়ায় হাজারির খুব ইচ্ছে তার মেয়ে টেপিকে দিয়ে বিয়ে দিবে বংশীর ভাগ্নেকে। আর এইদিকে টেপি এবং টেপির মা শহুরে জীবনের রীতিনীতি দেখে বিস্মিত হচ্ছিল। মোটর গাড়ি দেখলে হা করে তাকিয়ে থাকা , টকি দেখতে যাওয়া বড় বড় দালান কোঠার শহর দেখে চারিদিকেই বিস্মত।

হাজারি ঠাকুরের হোটেল যেমন উন্নতি করছিল অন্যদিকে রেলবাজারের রাণাঘাটের অন্যান্য হোটেলের হাল দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। এরপর ঘটে এক নতুন ঘটনা রেলের স্টেশনে রেলের অর্থ দিয়ে একটা হোটেল খোলা হবে। যার খরচ সম্পূর্ণ রেল কতৃপক্ষ প্রদান করবে। এই হোটেল খোলা নিয়ে শুরু হয় প্রতিযোগীতা কে পাবে সুযোগ। এই সুযোগ লুফে নেওয়ার জন্য রেলের অফিসে আবেদন করলো বেচু চক্কতি এবং আরেক হোটেল ব্যবসায়ী যদু বাঁড়ুয্যে কিন্তু সর্বশেষে সবাইকে পিছে ফেলে হাজারির নাম মালিকের জায়গায় স্থান পেল। রেলের হোটেলের দেখাশোনা শুরু করল বংশীর ভাগ্নে নরেন। এর মধ্যে একদিন পদ্ম ঝি ও হাজারি ঠাকুরকে ফিরে আসার কথা বললো তার আগের বেচু চক্কত্তির হোটেলে তা শুনে হাজারি ঠাকুর বিস্মিত হলো।

এরপর হাজারি ঠাকুরকে আর পিছে ফিরে দেখতে হয় নি। বম্বের এক রেলের হোটেলে থাকা খাওয়া কোয়ার্টার সুবিধাসহ দেড়শো টাকা মাইনের এক প্রস্তাব আসলো। হাজারি ঠাকুর রাজি হয়ে গেল রেলের হোটেলের স্বত্ব তার মেয়ে টেপির নামে করি দিল এবং নরেনকে ম্যানেজার করলো দুই রানাঘাটের দুই হোটেলেরই।

এরপর হাজারির কন্যা টেঁপির সাথে বংশীর ভাগ্নে নরেনের বিবাহ ঠিক হলো। বিবাহ অনুষ্ঠানে অতসীকে চিঠির মাধ্যমে নিমন্ত্রণ করা হলো। স্টেশনে হাজারি অতসীকে অভ্যর্থনা জানাতে গিয়ে দেখল যা তাতে তার মনে হলো পৃথিবীর সব আলো যেন নিভে গেছে। অতসীর বিধবা বেশ। পরদিন টেঁপির বিবাহ নরেনের সাথে সম্পন্ন হলো। বোম্বের রেলের হোটেলে হাজারি ঠাকুরের সাথে চুক্তি হয় তিন বছরের। অতসী বোম্বে যাওয়ার কথা শুনে হাজারি ঠাকুরের সাথে যাওয়ার জন্য বায়না ধরলে হাজারি বলে।
আগে তিনি গিয়ে ওখানকার পরিস্থিতি স্বচক্ষে দেখে তার পরের বার অতসীকে তার সাথে নিয়ে যাবে। এরপর হাজারি ঠাকুর বোম্বে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকলো। এর মধ্যে আশ্চর্যভাবে কিছু ঘটনা ঘটে হাজারির ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’ এ বেচু চক্কত্তি এবং পদ্ম ঝি চাকুরি নেয়। এরপর হাজারি ঠাকুর বোম্বে যাওয়ার দিন ঘনিয়ে আসে এই দিন স্টেশনে বিদায়ের সময় পদ্ম ঝি হাজারি ঠাকুরের পায়ে প্রণাম করে। হাজারি ঠাকুর তখন মনে করে তাকে ছোট করা কথা শুনানো পদ্ম দি। এই ঘটনায় হাজারি ঠাকুর একদিকে যেমন বিস্মিত হয় । তেমনি মনে মনে ভাবে তাকে একদিন ছোট করে কথা বলা পদ্ম দি আজ তার পায়ের ধুলো নিয়েছে তার জীবনে আর কি চাই তার জীবন আজ স্বার্থক।

গল্পে আসলে এক হার না মানা মানুষের জীবনে সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন ‘বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়’। মানুষ বয়স আসলে কোন ব্যাপার না। জীবনে উদ্যম আশা ইচ্ছা থাকলে যেকোন বয়সেই সততার সাথে তা পূরণ করা সম্ভব। মানুষের জীবনে উদ্যম আশাই তার শরীরে মনে শক্তি যোগায় । অন্যদিকে অনেক মানুষের অর্থ সম্পদ অনেক থাকার পরেও জীবনে কোন লক্ষ্য না থাকায় জীবনকে বৃথা মনে হয়। কোন কাজ করার ইচ্ছা বা শক্তি কোনটায় থাকে না। মনের শক্তির জোরে চাইলে যেকোন কিছু করা সম্ভব। অর্থ কোন কিছুরই বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। মানুষের মনে ইচ্ছা শক্তি থাকলে তিনি চাইলেই তার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবেন। যত বাঁধাই আসুক না কেন। তিনি হাজারি ঠাকুরের মতো সব বাঁধা পেরিয়ে নিজের লক্ষ্য পৌঁছে যাবে। যার জন্য প্রয়োজন মনের জোর ইচ্ছা শক্তি এবং সততা।

রিভিউ করেছেন- ফাবিহা বুশরা রওনক

গল্পসল্প বুক রিভিউ

 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

spot_img

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জুতা (ছোট গল্প)- আফিন্দী

জুতাবিদ্যুৎ’এর গলার তেজে ফাঁকা মেসরুম গমগম করে উঠলো, “ভাই, তুমি যাবে পাঁচ ভাইয়ে? খিদেয় আমার জান যায়! খালা...

মৃত্যু পরবর্তী জগতের অভিজ্ঞতা 

মৃত্যু পরবর্তী জগতের অভিজ্ঞতা  মৃত্যু পরবর্তী জীবনের অভিজ্ঞতা কেমন? মানুষ তার অনিশ্চিত জীবনে শুধু একটি বিষয়ের নিশ্চয়তা নিয়ে জন্মেছে।...

বুক রিভিউ- হুমায়ূন আহমেদের ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’

বুক রিভিউ- হুমায়ূন আহমেদের 'মেঘ বলেছে যাব যাব' বুক রিভিউ- হুমায়ূন আহমেদের 'মেঘ বলেছে যাব যাব'।বইয়ের নাম:মেঘ বলেছে যাব...

ডা. স্যাটান: সিরিয়াল কিলার ডা. মার্সেল পেটিওটের ভয়ংকর গল্প!

তাকে আখ্যা দেয়া হয়েছিল ডা. স্যাটান বলে। তিনি একই সাথে একজন সৈনিক, ডাক্তার, মেয়র, ভয়ঙ্কর অপরাধী এবং সিরিয়াল...