বুক রিভিউ- হুমায়ূন আহমেদের ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’

তারিখ:

পোস্ট শেয়ার করুন:

বুক রিভিউ- হুমায়ূন আহমেদের ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’

বুক রিভিউ- হুমায়ূন আহমেদের ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’।

বইয়ের নাম:মেঘ বলেছে যাব যাব
লেখক : হুমায়ূন আহমেদ
ধরণ : উপন্যাস
প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭
পৃষ্ঠাসংখ্যা: ২৪৪
মূল্য : ৪০০ টাকা

হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কালজয়ী লেখক। তাঁর প্রকাশিত উপন্যাসের মধ্যে অন্যতম পঠিত উপন্যাস হলো ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’। এই উপন্যাসে মধ্যবিত্ত পারিবারিক জীবনের এক গল্প তুলে ধরেছেন। উপন্যাসে অনেকগুলো চরিত্র রয়েছে।

উপন্যাসের চরিত্র পরিচিতি :

হাসান- গল্পের নায়ক কিংবা প্রধান চরিত্র
তিতলী- হাসানের প্রেমিকা
মতিন সাহেব- তিতলীর বাবা
সুরাইয়া- তিতলীর মা
নাদিয়া- তিতলীর ছোট বোন
রীনা- হাসানের ভাবি
তারেক- হাসানের বড় ভাই
রকেট ও বুলেট- তারেক সাহেবের ছেলে
রকিব- হাসানের ছোট ভাই
লায়লা- হাসানের বোন
রহমান- হাসানের বন্ধু
আশরাফুজ্জামান সাহেব- হাসানের বাবা
হিশামুদ্দিন সাহেব- বিশিষ্ট ব্যবসায়ী
চিত্রলেখা- হিশামুদ্দিন সাহেবের মেয়ে

সংক্ষেপে কাহিনী :

মধ্যবিত্ত পরিবারের বেকার ছেলে হাসান। আসলে তাকে বেকার বলা যায় না।  তার একটা কাজ আছে সে সপ্তাহে বুধবার হিশামুদ্দিন সাহেবের কথা শুনে নোট করে। এক ঘন্টা কথা শোনার জন্য তাকে ছয়শ টাকা দেওয়া হয়। হিশামুদ্দিন সাহেব নিজের জীবনী লেখাতে চাচ্ছেন। হাসান সপ্তাহে একদিন তার কথা শুনে খাতায় নোট করে। আর হাসান কয়েকটা টিউশনও পড়ায়। হাসান কিছুদিন থেকে স্বপ্ন দেখছে স্বপ্নে সে হাঁসের সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে নদীতে এবং হাঁসেদের মতো কপকপ করে শামুক গুগলি খাচ্ছে।
হাসানের শরীরটাও আজকাল ভালো যাচ্ছে না হুটহাট জ্বর আসছে। সেদিন রাতে তিতলীদের বাড়িতে গেল ভাত খেতে বসল তার জ্বর এতো বেড়ে গেল যে কিছু না খেয়েই বৃষ্টিতে ভিজে চলে এসেছে। রাতে তার প্রচন্ড জ্বর এলো। পরের দিন সকালে ঘুম ভাঙলেও সে কিছুক্ষণের মধ্যেই অচেতন হয়ে পড়লো। যখন জ্ঞান ফিরল তখন সে দেখল রীনা ভাবি তার মাথায় পানি ঢালছে আর বিলি কেটে দিচ্ছে।

হাসান মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। তাদের পরিবারে টাকার টানাপোড়ন প্রায়ই চলে। হাসানের বাবা চাকরি থেকে রিটায়ার্ড করেছেন। একমাত্র উপার্জনকারি হাসানের বড় ভাই তারেক সাহেব। একদিন রাকিব জরুরি বাড়িতে কল করে রীনাকে বলল যে তার পাঁচ হাজার টাকা লাগবে সে স্টুডেন্ট পলিটিক্সের একটা সমস্যায় পড়েছে। এইদিকে বাড়িতে টাকাও নেই। কোনমতে সে সমস্যার সমাধান হলেও। রাকিবরা কয়েকজন বন্ধু মিলে এক লোককে কিডন্যাপ করলো। আর সেখান থেকে রাকিব এক লাখ ত্রিশ হাজার টাকা ভাগ পেল। রাকিব সবার জন্যই উপহার কিনলো।

হাসান তিতলীর প্রেম কাহিনী আর দশটা প্রেমের মতোই। হাসান তিতলীকে যতটা ভালোবাসে ততটা প্রকাশ করে না। তিতলীদের বাসায় প্রায় হুটহাট চলে যায়। আর হাতে অবশ্যই থাকবে একটা চিঠি। তিতলী হাসানের চিঠি পড়ে মধ্যরাতে। হাসানের চিঠি অদ্ভুত সুন্দর। একদিন হাসান তিতলীদের বাসায় গেল নাদিয়া দরজা খুলে গল্প করলো তার সাথে। তিতলী বাসায় না থাকায় ; তিতলীর চিঠি নাদিয়াকে দিল তিতলীকে দেওয়ার জন্য। নাদিয়া উত্তেজনা থামাতে না পেরে চিঠি খুলে দেখল। দুই পৃষ্ঠার চিঠিতে শুধু গুণ চিহ্ন আঁকা। এইরকম প্রায়ই অদ্ভুত কাজ করে হাসান ।

হাসান সোমবার তিতলীর কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। তিতলীর বারোটায় ক্লাস শেষ হলে তারা ঘুরাঘুরি করে। প্রতিবার আলাদা আলাদা জায়গায় ঘুরতে বেড়োয়। একদিন তিতলীর কলেজে একটা ক্লাস হয়ে ছুটি হয়ে গেল। এগারোটায় কলেজের সামনে বের হয়ে হাসানকে দেখতে পেল। হাসানসহ তারা বুড়িগঙ্গায় নৌকা করে ঘুরে বিকেল চারটায় তিতলী বাড়ি ফিরল। সেইদিনই রাত আটটায় তিতলীর বিয়ে হয়ে গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওলজির এক লেকচারারের সঙ্গে। কিভাবে ঘটনা ঘটল তিতলী নিজেও বুঝলো না। তার শুধু মনে আছে তার বাবা মতিন সাহেব তার সামনে কাঁদতে কাঁদতে অনুরোধ করছে। তিতলীর বাবা তার সামনে কোনদিন কাঁদে নি। তিতলী কিছুই করতে পারলো তার মাথা কাজ করলো তার বিয়েটা হয়ে গেল।

হাসান তিতলীর বিয়ে হয়েছে জানত না, তিতলীদের বাসায় যাওয়ার পর জানতে পারে। হিশামুদ্দিন সাহেবের বাসায় হাসান জানতে পারলো উনার মেয়ে চিত্রলেখা এসেছে। চিত্রলেখা হাসানের সাথে ভদ্রতার সাথে কথা বলল। হাসান কিভাবে তার বাবার জীবনী লেখে তা দেখল তার বাবার এবং হাসানের গল্প শুনল। এর মধ্যে একদিন হিশামুদ্দিন সাহেবের শরীর খুব খারাপ হলো। পরের বুধবার যখন হাসান হিশামুদ্দিন সাহেবের সাথে কথা বলতে আসবে তখন তার বাড়ির অবস্থা দেখে বুঝলো হিশামুদ্দিন সাহেব মারা গেছেন। হাসান আর ভেতরে গেল না।

তিতলী আর তার লেকচারার বর শওকতের জীবন বক্ররেখার মতো চলছে। শওকত সাহেব তিতলীকে যে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হয় শুধুমাত্র তার উত্তর দেয়। আর সবসময়ই মুখ শক্ত করে থাকে। শওকত তিতলীর সাথে যথাসম্ভব ভাব করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তিতলীর কাছ থেকে সেরকম কিছু দেখতে পারছে না। শওকত হাসানের সাথে দেখা করে কথা বলবে মনে মনে ধরে রেখেছে। তার ধারণা একদিন না একদিন তিতলী তাকে মেনে নিবে। তার সাথে আর মুখ শক্ত করে কথা বলবে না।

হাসানের বড় ভাই তারেক অফিসের এক নতুন ডিভোর্সি মেয়ে লাবণীর সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। সে প্রথম প্রথম মিথ্যা কথা বলে প্রায়ই বাড়ির বাইরে লাবণীর সাথে দেখা করতে যেত। রীনা তার বউ তাকে অগাধ বিশ্বাস করতো। সে তারেককে খুব সাধারণ মানুষ মনে করত। যে কখনো মিথ্যা বলতে পারে না। এর মধ্যে এক ঘটনার মাধ্যমে রীনা জানতে পারলো হাসান আর লাবণীর সম্পর্ক অনেকদূর এগিয়েছে। সে নীরবে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল। কল্যাণময়ী এই নারি কাউকে কিছুই বলল না। এই পরিবারের জন্য হাজার ত্যাগ করা নারী আবার তার স্বামীকে ত্যাগ করলো নীরবে।

চিত্রলেখার বাবা মারা যাওয়ার পর সে তার বাবার অফিসে বসলো। এর মধ্যে একদিন হাসান থানায় যেতে হলো হাসানকে। হাসান সেখানে মুখোমুখি হলো এক নির্মম সত্যের তার ভাই রকিবের লাশ শনাক্ত করতে হলো তাকে। হাসানের শরীর এর মধ্যে অনেক খারাপ হলো। তার ব্রেন টিউমার ধরা পড়লো। যার শিকড় পর্যন্ত গজিয়েছে। তার সাথে তার বোন লায়লা দেখা করতে আসলেই জুড়ে দেয় তার বাড়ির গল্প। তার ছাত্রী সুমিও গোলাপ ফুল নিয়ে দেখা করতে আসে। চিত্রলেখা যদিও হাসানের সাথে দেখা করতে আসে। তার চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে অনেক ভালো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। হাসানদের আর বুড়িগঙ্গায় নৌকায় ভাসা হয় না। হাসানের বন্ধু লিটনের মেয়ে হয় হাসানের পাঠানো ‘তিতলী’ আর ‘চিত্রলেখা’ নামের মধ্যে সে তার মেয়ের নাম রাখে চিত্রলেখা।

পাঠপ্রতিক্রিয়া :

‘মেঘ বলেছে যাব যাব’ পড়া শেষ করে মন এক বিষণ্ণতায় ছেয়ে যায়। গল্পের প্রধান চরিত্র হাসানের জন্য মন খারাপ হয়ে যায়। চমৎকার ছেলেটির জীবনের শেষ পরিণতি কী কষ্টের সাথেই না হয়। আর রীনা ভাবির কত ভালোবাসার সংসার কি রকম নীরবে ভেঙে যায়। আর ফিরে আসা হয় না রীনা ভাবির। চিত্রলেখার একা জীবনে আর কেউ কী এসেছিল? হুমায়ূন আহমেদের লেখা মানেই সুন্দর এবং নতুন অনুভূতির সাথে পরিচিত হওয়া। তার গল্পের চরিত্রগুলোকে আজগুবি মনে হলেও আবার মনে হয় এমন চরিত্রের মানুষও বোধ হয় আছে। মানুষের জীবন নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ লিখতে পছন্দ করতেন। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত জীবন যেন তাঁর কলমের আঁচড়ে ফুটে উঠতো সবচেয়ে চমৎকারভাবে। এই ধারায় তিনি অনেকগুলো উপন্যাস লিখেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলো হচ্ছে নন্দিত নরকে, শংখনীল কারাগারা, অপেক্ষা ইত্যাদি। ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’ এই ধারায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

গল্পসল্প বুক রিভিউ 

বইটির আরো রিভিউ পাবেন এই লিংকে

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

spot_img

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জুতা (ছোট গল্প)- আফিন্দী

জুতাবিদ্যুৎ’এর গলার তেজে ফাঁকা মেসরুম গমগম করে উঠলো, “ভাই, তুমি যাবে পাঁচ ভাইয়ে? খিদেয় আমার জান যায়! খালা...

মৃত্যু পরবর্তী জগতের অভিজ্ঞতা 

মৃত্যু পরবর্তী জগতের অভিজ্ঞতা  মৃত্যু পরবর্তী জীবনের অভিজ্ঞতা কেমন? মানুষ তার অনিশ্চিত জীবনে শুধু একটি বিষয়ের নিশ্চয়তা নিয়ে জন্মেছে।...

ডা. স্যাটান: সিরিয়াল কিলার ডা. মার্সেল পেটিওটের ভয়ংকর গল্প!

তাকে আখ্যা দেয়া হয়েছিল ডা. স্যাটান বলে। তিনি একই সাথে একজন সৈনিক, ডাক্তার, মেয়র, ভয়ঙ্কর অপরাধী এবং সিরিয়াল...

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর রহস্যময় অন্তর্ধান!

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর রহস্যময় অন্তর্ধান! ১৯৪৫ সালে জাপানের তাইহুকু শহরের সেই প্লেন দুর্ঘটনা! নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বলেছিলেন,"সবাই বলে রাজনীতি নোংরা-আবর্জনা।...